Advertisement
অন্যান্য টপিকনবীদের জীবনী

বদরের যুদ্ধ পার্ট ৮

সেনা বিন্যাস ও রাত্রি যাপন

Advertisement

এরপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সৈন্যদেরকে বিন্যস্ত করেন[1] এবং যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হন। সেখানে তিনি স্বীয় পবিত্র হাত দ্বারা ইশারা করে করে যাচ্ছিলেন, ‘এটা হবে ভাবীকাল ইনশাআল্লাহ[2] অমুকের বধ্যভূমি এবং এটা আগামী কাল হলে ইনশাআল্লাহ অমুকের বধ্যভূমি।’ এরপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সেখানে একটি গাছের মূলের পাশে রাত্রি যাপন করেন এবং মুসলিমরাও পূর্ণ শান্তিতে রাত্রি অতিবাহিত করেন। তাঁদের অন্তর আল্লাহর উপর ভরসায় পরিপূর্ণ ছিল। তাঁদের এ আশা ছিল যে, প্রত্যুষেই তাঁরা স্বচক্ষে প্রতিপালকের শুভ সংবাদের বাণী দেখতে পাবেন। আল্লাহ পাক বলেন,

স্মরণ কর, যখন আল্লাহ তাঁর নিকট হতে প্রশান্তি ধারা হিসেবে তোমাদেরকে তন্দ্রায় আচ্ছন্ন করেছিলেন, আকাশ হতে তোমাদের উপর বৃষ্টিধারা বর্ষণ করেছিলেন তোমাদেরকে তা দিয়ে পবিত্র করার জন্য। তোমাদের থেকে শায়ত্বনী পংকিলতা দূর করার জন্য, তোমাদের দিলকে মজবুত করার জন্য আর তা দিয়ে তোমাদের পায়ের ভিত শক্ত করার জন্য।’ (আল-আনফাল ৮ : ১১)

এ রাতটি ছিল হিজরী ২য় সনের ১৭ই রমাযানের জুমুআহর রাত। ঐ মাসেরই ৮ই অথবা ১২ই তারীখে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মদীনা থেকে রওয়ানা হয়েছিলেন।

যুদ্ধ ক্ষেত্রে মক্কা সৈন্যদের আগমন এবং তাদের পারস্পরিক মতানৈক্য

অপরপক্ষে কুরাইশরা উপত্যকার বাইরে দিকে তাদের শিবিরে রাত্রি যাপন করে। আর প্রত্যুষে পুরো বাহিনী সহ টিলা হতে অবতরণ করে বদরের দিকে রওয়ানা হয়। একটি দল রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর হাউযের দিকে অগ্রসর হয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘তাদেরকে ছেড়ে দাও।’ তাদের মধ্যে যেই পানি পান করেছিল সেই এ যুদ্ধে নিহত হয়েছিল। শুধু হাকীম ইবনু হিযামের প্রাণ বেঁচেছিল। সে পরে মুসলিম হয়েছিল এবং পাকা মুসলিমই হয়েছিল। তার নিয়ম ছিল যে, যখন সে দৃঢ় শপথ করত তখন বলত ঐ সত্ত্বার শপথ! যিনি আমাকে বদরের দিন হতে পরিত্রাণ দিয়েছেন।

ওদিকে কুরাইশ সৈন্যদলে মহা কোলাহল শুরু হয়েছে। কেউ অহংকার ভরে চিৎকার করছে এবং কেউ ক্রোধভরে মাটিতে পদাঘাত করছে। এ সময় কুরাইশ দলপতির আদেশক্রমে উমায়ের ইবনু অহাব নামক এক ব্যক্তি মুসলিমদের সংখ্যা নির্ণয় করার জন্য অশ্বরোহণে তাদের চারদিক প্রদক্ষিণ করে চলে যায়। স্বদলে ফিরে এসে উমায়ের বলতে শুরু করে মুসলিমদের সংখ্যা কমবেশি তিনশ হবে এবং তাদের পশ্চাতে সাহায্য করারও কেউ নেই। তরবারী ছাড়া আত্মরক্ষার জন্যে কোন উপকরণ তাদের সাথে নেই, এটাও আমি উত্তমরূপে বুঝতে পেরেছি। কিন্তু তারা এমন সুবিন্যস্তভাবে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হয়ে আছে যে, আমরা আমাদের একটি প্রাণের বিনিময় ছাড়া তাদের একটি প্রাণনাশ করতে পারবো না। কাজেই এ যুদ্ধে আমাদের পক্ষের অন্তত তিনশত প্রাণ উৎসর্গ না করে আমরা কোন ক্রমেই বিজয় লাভে সক্ষম হব না। যদি তারা আমাদের বিশেষ বিশেষ লোকদেরকে হত্যা করে ফেলে তবে এর পরে বেঁচে থাকার সাধ আর কী থাকতে পারে? অতএব, আমাদের কিছু চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে।’

উমায়েরের এ কথা শুনে যুদ্ধের ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্পকারী আবূ জাহেলের সামনে আরেক সমস্যা দেখা দিল। লোকারো তাকে যুদ্ধ করা ছাড়াই মক্কায় ফিরে যেতে বললো। হাকীম ইবনু হিযাম নামক কুরাইশ দলপতির চৈতন্যেদয় হল। তিনি দাঁড়িয়ে এক নীতি দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন এবং সকলকে বুঝাবার চেষ্টা করলেন যে, এ অন্যায় সমরে প্রবৃত্ত হওয়ার কোনই কারণ নেই, তিনশত প্রাণ বলি দিয়ে এ যুদ্ধে বিজয় লাভের সার্থকতাও কিছুই নেই। হাকীম বক্তৃতা দিয়ে ক্ষান্ত হলেন না। তিনি ‘উতবাহ ইবনু রাবীআহ নামক কুরাইশ দলপতির নিকট উপস্থিত হয়ে নিজের মনোভবতার কাছে ব্যক্ত করলেন। ‘উতবাহ হাকীমের কথার যৌক্তিকতা অস্বীকার করতে পারল না। হাকীম তখন আশান্বিত হয়ে বললেন, ‘দেখুন, আপনি ধনে মানে কুরাইশের একজন বরেণ্য ব্যক্তি। সুতরাং আপনি একটু দৃঢ়তা অবলম্বন করে এ অন্যায় যুদ্ধ হতে স্বজাতিকে বিরত রাখুন, তাহলে আরবের ইতিহাসে আপনার নাম চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’ ‘উতবাহ উত্তরে বলল, ‘আমি তো প্রস্তুত আছি। এক ‘আমর বিন হাযরামীর (যে সারিয়্যায়ে নাখলাহতে মারা গিয়েছিল) রক্তপণ, সেটাও আমি নিজে পরিশোধ করে দিতে পারি। কিন্তু হানযালিয়ার পুত্রকে (আবূ জাহল) কোন যুক্তির দ্বারাই বিরত রাখা সম্ভব নয়। যাহোক, তুমি তার কাছে গিয়ে চেষ্টা করে দেখো, তোমার প্রস্তাবে আমার সম্মতি রয়েছে।’

তারপর ‘উতবাহ দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখতে লাগল। বলল, ‘হে কুরাইশগণ! তোমরা মুহাম্মাদ (সাঃ), তাঁর সঙ্গীদের সাথে যুদ্ধ করে কোন বাহাদুরী করবেনা। আল্লাহর শপথ! যদি তোমরা তাঁদেরকে হত্যা করে ফেল তাহলে এমন চেহেরাসমূহ দেখতে পাওয়া যাবে যেগুলোকে দেখা পছন্দনীয় হবে না। কেননা এ যুদ্ধে হয় চাচাতো ভাই নিহত হবে নতুবা খালাতো ভাই কিংবা নিজের গোত্রেরই লোক নিহত হবে। সুতরাং ফিরে চল এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) ও গোটা আরব দুনিয়াকে ছেড়ে দাও। যদি আরবের অন্য লোকেরা মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে হত্যা করে ফেলে তাহলে তো সেটা তোমাদের কাঙ্খিত কাজই হবে। অন্যথা মুহাম্মাদ (সাঃ) তোমাদেরকে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখবেন যে, তোমরা তাঁর প্রতি তোমাদের করণীয় কাজটি করো নি।

এদিকে হাকীম আবূ জাহলের নিকট হাযির হয়ে নিজের ও ‘উতবাহর মতামত ব্যক্ত করলেন। হাকীমের কথা শুনে আবূ জাহলের আপাদমস্তক জ্বলে উঠল। সে ক্রোধান্বিত স্বরে বলতে লাগল, আল্লাহর শপথ, মুহাম্মাদ ও তার সাথীদের দেখার পর ‘মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর যাদু ‘উতবাহর উপর বিশেষ কার্যকরী হয়েছে। কক্ষনো না, আল্লাহর শপথ! আমাদের ও মুহাম্মাদের মধ্যে আল্লাহর ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত আমরা ফিরে যাব না। না, না এতক্ষণে বুঝতে পেরেছি, ‘উতবাহর পুত্র মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর দলভুক্ত (‘উতবাহর পুত্র আবূ হুযাইফা (রাঃ) প্রথম পর্যায়ের মুসলিম ছিলেন এবং হিজরত করে মদীনায় গিয়েছিলেন)। সে যুদ্ধ ক্ষেত্রে উপস্থিত। তার নিহত হওয়ার আশঙ্কায় নরাধম এমন বিচলিত হয়ে পড়েছে। ধিক্ শত ধিক তাকে।’

হাকীম তখন আবূ জাহলকে সেখানে রেখে ‘উতবাহর নিকট গমন করে সমস্ত বৃত্তান্ত প্রকাশ করলেন। ক্রোধ, অভিমান ও অহংকারে ‘উতবাহ একেবারে আতমবিস্মৃত হয়ে পড়লো। সে বলে উঠল, কী, আমি ভীরু? আমি কাপুরুষ? পুত্রের মায়ায় আমি বীরধর্মে জলাঞ্জলি দিচ্ছি। আচ্ছা, তাহলে আরববাসী দেখুক, জগদ্বাসী দেখুক যে, কে বীর পুরুষ, আমি ততক্ষণ ফিরব না যতক্ষণ না মুহাম্মাদের সঙ্গে একটা চূড়ান্ত বোঝাপড়া হয়। এ বলে সে সদল বলে সমরাঙ্গনে এগিয়ে চলল। আর ওদিকে আবূ জাহল ছুটে গিয়ে ‘আমির ইবনু হযরামীকে বলল, ‘দেখছ কি, তোমার ভ্রাতার প্রতিশোধ গ্রহণ আর সম্ভব হবে না। কাপুরুষ ‘উতবাহ সদল বলে যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করে যাচ্ছে। শীঘ্র উঠে আর্তনাদ করতে শুরু কর।’

আবূ জাহলের কথা শেষ হতে না হতেই ‘আমির তার সকল অঙ্গে ধূলো বালি মাখতে মাখতে এবং গায়ের কাপড় ছিঁড়তে ছিঁড়তে নিহত ভ্রাতার নাম নিয়ে আর্তনাদ করে বেড়াতে লাগল। আর যায় কোথায়, মুহূর্তের মধ্যে হাকীমের সমস্ত পরিশ্রম পশু হয়ে গেল। ক্ষণিকের মধ্যেই রণ পিপাসু মুশরিক বাহিনীর বীভৎস চিৎকার দিগ্বিদিক ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত করে তুলল এবং রণাঙ্গন প্রকম্পিত হয়ে উঠল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button