অন্যান্য টপিকইসলামিক খবরইসলামিক ঘটনানবীদের জীবনী

মক্কা বিজয়ের যুদ্ধ পর্ব ৫

ইসলামী সৈন্য মাররায্যাহরান হতে মক্কার দিকে (الْجَيْشُ الْإِسْلاَمِيْ يُغَادِرُ مَرِّ الظَّهْرَانِ إِلٰى مَكَّةَ):

ঐ সকালেই মঙ্গলবার ৮ম হিজরী ১৭ ই রমাযান রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মাররুয যাহরান হতে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হলেন। তিনি আব্বাস (রাঃ)-কে এ বলে নির্দেশ প্রদান করলেন যে, ‘আবূ সুফইয়ানকে উপত্যকার সংকীর্ণতার উপর পর্বত প্রান্তে থামিয়ে রাখবে যাতে ঐ পথ দিয়ে গমণাগমণকারী আল্লাহর সৈনিকদের সে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করতে পারে। আব্বাস (রাঃ) রাসলুল্লাহ (সাঃ)-এর নির্দেশ পালন করলেন। এদিকে গোত্রগুলো নিজ নিজ পতাকা বহন করছিলেন এবং সেখান দিয়ে যখন কোন গোত্র গমন করত তখন আবূ সুফইয়ান জিজ্ঞেস করতেন, এ সকল লোকজন কারা?’ উত্তরে আব্বাস (রাঃ) উদাহরণস্বরূপ হয় তো বলতেন, ‘বনু সুলাইম। আবূ সুফইয়ান তখন বলতেন, ‘সুলাইমের সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক?

অতঃপর পরবর্তী গোত্রের গমনের সময় আবূ সুফইয়ান জিজ্ঞেস করলেন এরা কারা?

আবূ সুফইয়ান বললেন, ‘মুযায়নাহ’।

আবূ সুফইয়ান বললেন, ‘মুযায়নাহর সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী?’

এমনিভাবে গোত্রগুলো এক এক করে গমন করল, যখন কোন গোত্র গমন করত তখন আবূ সুফইয়ান আব্বাস (রাঃ)-কে তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন, যখন তাঁর প্রশ্নের উত্তর দেয়া হতো তখন তিনি গোত্রের নাম ধরে বলতেন, ‘এর সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী?’

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন তাঁর সবুজ দলের মাঝে অত্যন্ত জাঁকজমক ও জমকালো অবস্থার মধ্য দিয়ে আগমন করলেন তিনি মুহাজির ও আনসারদের দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন। এখানে মানুষ ব্যতিরেকে শুধু লোহার বেড়া দেখা যাচ্ছিল। আবূ সুফইয়ান বললেন, ‘সুবহানল্লাহ! হে আব্বাস! এরা কারা?’

তিনি বললেন, ‘আনসার ও মুহাজিরগণের জাঁকজমকপূর্ণ অবস্থার মধ্য দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আগমন করছেন।’ আবূ সুফইয়ান বললেন, ‘এদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষমতা কি কারো কখনো হতে পারে?’

এরপর আরো বললেন, ‘আবুল ফযল! তোমার ভাতিজার রাজত্ব আল্লাহ বড় জবরদস্ত করে দিয়েছেন।’

আব্বাস (রাঃ) বললেন, ‘আবূ সুফইয়ান! এ হচ্ছে নবুওয়াতী সম্মান।’

আবূ সুফইয়ান বললেন, ‘হ্যাঁ’, এখন তো তাই বলতে হবে।’

এ সময়ে আরও একটি ঘটনা ঘটে যায়। আনসারদের পতাকা ছিল সা‘দ বিন উবাইদা (রাঃ)-এর নিকট। তিনি আবূ সুফইয়ানের নিকট দিয়ে যেতে যেতে বললেন, ‘আজ রক্তক্ষরণ এবং মারপিটের দিন, আজ হারামকে হালাল করা হবে।’

আজ কুরাইশদের ভাগ্যে অপমান নির্ধারিত করে রেখেছেন। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সেখানে দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, তখন আবূ সুফইয়ান বললেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ্! আপনি সে কথা শুনেননি যা সা‘দ বলল। তিঁনি বলেলেন, সা‘দ কী বলেছেন, আবূ সুফইয়ান বললেন, ‘এ কথা বলেছে।’

এ কথা শুনে উসমান (রাঃ) এবং আব্দুর রহমান বিন আওফ (রাঃ) আরয পেশ করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমরা এ ভয় করছি যে, সা‘দ আবার না জানি কুরাইশদের মারধর শুরু করে দেয়।’

আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বললেন, (‏بَلْ الْيَوْمَ يَوْمٌ تُعَظَّمُ فِيْهِ الْكَعْبَةِ، الْيَوْمَ يَوْمٌ أَعَزَّ اللهُ فِيْهِ قُرَيْشاً‏)‏ ‘না তা হবে না, বরং আজকের দিনটি হবে সে দিন যে দিন কা‘বা ঘরের যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদর্শিত হবে। আজকের দিনটি হবে সে দিন যে দিন আল্লাহ তা‘আলা কুরাইশদের ইজ্জত প্রদান করবেন। ’

এর পর নাবী কারীম (সাঃ) লোক পাঠিয়ে সা‘দ (রাঃ)-এর নিকট থেকে পতাকা আনিয়ে নিয়ে তাঁর পুত্র কায়েসের হাতে প্রদান করেন। উদ্দেশ্য ছিল এটা তাঁকে বুঝতে দেয়া যে, পতাকা খানা তাঁর হাতেই রইল, তাঁর থেকে বের হল না। অবশ্য, এ কথাও বলা হয়েছে যে, নাবী কারীম (সাঃ) পতাকা নিয়ে যুবাইর (রাঃ)-এর হাতে প্রদান করেছিলেন।

আকস্মিকভাবে ইসলামী সৈন্য কুরাইশদের মাথার উপর (قُرَيْشٌ تَبَاغَتَ زَحْفَ الْجَيْشِ الْإِسْلاَمِيْ):

রাসূলে কারীম (সাঃ) যখন আবূ সুফইয়ানের নিকট হতে চলে গেলেন তখন আব্বাস (রাঃ) তাঁকে বললেন, ‘শীঘ্র এখন মক্কায় নিজ সম্প্রদায়ের নিকট প্রত্যাবর্তন কর।’ আবূ সুফইয়ান অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে মক্কায় ফিরে এসে উচ্চকণ্ঠে এ বলে আহবান জানালেন, ‘ওহে কুরাইশগণ! মুহাম্মাদ (সাঃ) এমন এক বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কা আগমন করছেন যার সঙ্গে মোকাবেলা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষমতা কারও নেই। কিন্তু যারা আবূ সুফইয়ানের গৃহে প্রবেশ করবে তারা আশ্রিত হবে। এ কথা শুনে তাঁর স্ত্রী হিন্দা বিনতে ‘উতবাহ এসে তাঁর মোচ ধরে বলল, ‘মেরে ফেল এ চর্বিযুক্ত ও শক্ত মাংসধারী মশককে। এরূপ সংবাদ পরিবেশকারী ও পূর্বাভাষদাতা বিনষ্ট হোক।

আবূ সুফইয়ান বলল, ‘তোমাদের সর্বনাশ হোক। দেখ, তোমাদের জীবন সম্পর্কে এ মহিলা যেন তোমাদের ধোঁকায় নিক্ষেপ না করে। কারণ মুহাম্মাদ (সাঃ) এত অধিক সংখ্যক সৈন্য নিয়ে আগমন করছেন যে, এর সঙ্গে মোকাবেলা করার সাধ্য কারও নেই। এমতাবস্থায় যে আবূ সুফইয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে আশ্রয় লাভ করবে।

লোকেরা বলল, ‘আল্লাহ যেন তোমাকে ধ্বংস করে। তোমার বাড়ি আমাদের কত জনের আশ্রয় স্থান হবে?’

আবূ সুফইয়ান বললেন, ‘আরো কথা আছে। যারা ভিতর থেকে নিজ নিজ ঘরের দরজা বন্ধ রাখবে তারাও আশ্রিত বলে গণ্য হবে। অধিকন্তু, যারা মসজিদুল হারামে গিয়ে প্রবেশ করবে তারাও আশ্রিত বলে গণ্য হবে। এ কথা শোনার পর লোকেরা সকলে নিজ নিজ ঘর ও মসজিদুল হারাম অভিমুখে পলায়ন করতে থাকল।

তবে কিছু সংখ্যক লম্পটকে তারা মুসলিমগণের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিল এবং বলল যে, ‘এদেরকে আমরা অগ্রভাগে রাখছি। যদি কুরাইশগণ কৃতকার্য হয় তাহলে আমরা তাদের সঙ্গে মিলিত হব, কিন্তু যদি তাদের খুব মারধর করা হয় তাহলে আমাদের নিকট হতে যা কিছু চাওয়া হবে আমরা মেনে নিব।

মুসলিমগণের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য এ সকল নির্বোধ কুরাইশগণ ইকরামা বিন আবূ জাহল, সফওয়ান বিন উমাইয়া এবং সোহাইল বিন আমরের পরিচালনায় খান্দাময় একত্রিত হল। তাদের মধ্যে বনু বাকর গোত্রের হেমাস বিন ক্বায়স নামক এক লোকও ছিল যে, ইতোপূর্বে অস্ত্র ঠিক ঠাক করছিল। এ প্রেক্ষিতে তার স্ত্রী এক দিন বলেছিল, ‘আমি যা কিছু দেখছি তা কিসের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে?’

সে বলল, ‘মুহাম্মাদ ও তাঁর সাথীদের সঙ্গে মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।’

স্ত্রী বলল, ‘আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ (সাঃ) এবং তাঁর সঙ্গী সাথীদের মোকাবেলায় কোন কিছুই স্থির হতে পারবে না।’

সে বলল, ‘আল্লাহর শপথ! আমার আশা যে, আমি মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর কোন সঙ্গীকে তোমার খাদেম করে ছাড়ব।’ তারপর সে বলল,

إن يقبلوا اليوم فمالي عِلَّه ** هٰذَا ســلاح كامــل وألَّه

وذو غِرَارَيْن سريع السَّلَّة **

অর্থ : তারা যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসে তবে আমার কোন আপত্তি হবে না। এ হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র, লম্বা ফলা বিশিষ্ট বর্শা এবং আকস্মিক আক্রমণাত্মক দু’ ধার বিশিষ্ট তরবারী রয়েছে।

খান্দামর যুদ্ধে এ ব্যক্তিও এসেছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker