Advertisement
অন্যান্য টপিকইসলামিক ছবিইসলামিক ভিডিওনবীদের জীবনী

মক্কা বিজয়ের যুদ্ধ পার্ট ৬

যূ-তুওয়া নামক স্থানে ইসলামী সৈন্য (الْجَيْشُ الْإِسْلاَمِيْ بِذِيْ طُوٰى):

অগ্রগমনের এক পর্যায়ে রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর বাহিনী মাররুয যাহরান হতে যু তুওয়ায় গিয়ে পৌঁছলেন, সে সময় আল্লাহ প্রদত্ত বিজয়ীর সম্মানের জন্য অত্যধিক বিনয়ের সঙ্গে নাবী কারীম (সাঃ) স্বীয় মস্তক এমন ভাবে অবনমিত রেখেছিলেন যে, দাড়ির লোম সওয়ারীর খড়ির সঙ্গে গিয়ে লাগছিল। নাবী কারীম (সাঃ) যু তুওয়ায় গিয়ে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা বিধান ও বিন্যাস করে নিলেন। ডান পাশে নিযুক্ত করলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ)-কে। সে স্থানে ছিল আসলাম, সুলাইম, গিফার, মুযায়নাহ, জুহায়ানাহ এবং আরও অন্যান্য গোত্রসমূহ। খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ)-কে নির্দেশ দেয়া হল নীচু অঞ্চল দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করতে। কুরাইশগণ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে তাদের সকলকে হত্যা করে দিবে, তারপর সাফা পাহাড়ের উপর নাবী কারীম (সাঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাত করবে।

Advertisement

যুবাইর বিন ‘আউওয়াম (রাঃ) ছিলেন বাম পাশে। তাঁর সঙ্গে ছিল রাসূলে কারীম (সাঃ)-এর পতাকা। নাবী কারীম (সাঃ) তাঁকে দির্দেশ প্রদান করলেন মক্কার উপরিভাগ অর্থাৎ কাদা’ নামক স্থান দিয়ে প্রবেশ করতে এবং হাজূনে গিয়ে পতাকা উত্তোলন করে তথায় তাঁর জন্য অপেক্ষা করতে।

পদাতিক সৈন্যদের নেতৃত্বে ছিলেন আবূ উবাইদাহ (রাঃ)। তাঁকে নির্দেশ প্রদান করেছিলেন, বাতনে ওয়াদীর পথ দিয়ে এমনভাবে অগ্রসর হতে যাতে তিনি রাসূলে কারীম (সাঃ)-এর পূর্বেই মক্কায় অবতরণ করতে সক্ষম হন।

মক্কায় ইসলামী সৈন্যের প্রবেশ (الْجَيْشُ الْإِسْلاَمِيْ يَدْخُلُ مَكَّةَ):

উপর্যুক্ত এ নির্দেশনা লাভের পর ভিন্ন ভিন্ন বাহিনী নিজ নিজ নির্ধারিত পথ ধরে অগ্রসর হতে থাকলেন। খালিদ বিন ওয়ালীদের  বাহিনীর সম্মুখে যে সকল মুশরিক এসেছিল তাদের সকলকেই হত্যা করা হল। অবশ্য, তাঁর বন্ধুদের মধ্যে থেকে কুরয বিন জাবির ফিহরী এবং খুনাইস বিন খালিদ বিন রাবী’আহ শাহাদাতের পিয়ালা পান করেন। এর কারণ ছিল এই যে এ দু’ জন সেনা বাহিনী থেকে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ভিন্ন পথ ধরে গমন করছিলেন। সেই অবস্থায় তাদের হত্যা করা হয়।

খান্দামায় পৌঁছানোর পর খালিদ (রাঃ) এবং কুরাইশ লম্পটদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সামান্য সংঘর্ষে বারো জন মুশরিক নিহত হওয়ার পর তাদের মধ্যে পলায়নের হিড়িক পড়ে যায়। হেমাস বিন ক্বায়স- যে মুসলিমগণের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য পূর্ব থেকেই অস্ত্রশস্ত্র ঠিক-ঠাক করে রেখেছিল- যুদ্ধক্ষেত্রে পলায়ন করার পর নিজ গৃহে প্রবেশ করল এবং তার স্ত্রীকে বলল, দরজা বন্ধ করে দাও।’ তার স্ত্রী বলল, ‘ওই কথাটি কোথায় গেল যা তুমি বলতেছিলে?’ উত্তরে সে বলল,

إنك لو شهدت يوم الخندمة          إذ فر صفوان وفر عكرمه

واستقبلتنا بالسيوف المسلمه         يقطعن كل ساعد وجمجمه

ضربا فلا يسمع إلا غمغمه           لهم نهيت خلفنا وخمهمه

অর্থ:  ‘তুমি যদি খান্দামায় যুদ্ধের অবস্থা দেখতে যখন সাফওয়ান ও ইকরামা পলায়ন করতে উদ্যত হয় এবং উন্মুক্ত তরবারী দিয়ে আমাদের অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করা হয় যা হাতের কবজি এবং মাথার খুলিগুলোকে এমন ভাবে কর্তন করছিল যে পিছনে তাদের গর্জন ও গোলমাল ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। তবে তুমি নিন্দনীয় একটুও কথা বলতে পারতে না।’

এরপর খালিদ (রাঃ) দৃপ্ত পদে মক্কার গলি পথগুলো অতিক্রম করে সাফা পাহাড়ের উপর রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সঙ্গে মিলিত হন।

এদিকে যুবাইর (রাঃ) অগ্রভাগে এগিয়ে গিয়ে হাজুন নামক স্থানে ফাতাহ মসজিদের নিকট রাসূলুল্লাহর (সাঃ) পতাকা উত্তোলন এবং তাঁর জন্য একটি তাঁবু নির্মাণ করেন। অতঃপর সেখানে একটানা অবস্থান করতে থাকলেন যতক্ষণ না রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সেখানে আগমন করলেন।

মাসজিদুল হারামের রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর প্রবেশ ও মূর্তি অপসারণ (الرَّسُوْلُ ﷺ يَدْْخُلُ الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ وَيُطَهِّرُهُ مِنْ الْأَصْنَامِ):

এরপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) উঠলেন এবং সম্মুখে পেছনে ডান ও বাম পাশে মোতায়েন আনসার ও মুহাজির পরিবেষ্টিত অবস্থায় অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে মাসজিদুল হারামে আগমন করলেন। মাসজিদুল হারামে আগমনের পর সর্বাগ্রে তিনি হাজার আসওয়াদ চুম্বন করলেন এবং তার পর আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করলেন। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর হাতে একটি কামান (ধনুক) ছিল এবং আল্লাহর ঘরের আশপাশে ও ছাদের উপর ৩৬০টি মূর্তি ছিল। নাবী কারীম (সাঃ) সে ধনুক দ্বারা মূর্তিগুলোকে আঘাত করতে করতে বলেছিল,

‏{‏جَاء الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ إِنَّ الْبَاطِلَ كَانَ زَهُوْقًا‏} ‏‏[‏الإسراء‏:‏81‏]‏

{‏قُلْ جَاء الْحَقُّ وَمَا يُبْدِئُ الْبَاطِلُ وَمَا يُعِيْدُ‏}‏ ‏[‏سبأ‏:‏49‏]‏

‘হক এসেছে এবং বাতিল বিলুপ্ত হয়েছে। আর বাতিল বিলুপ্ত হওয়ারই বিষয়।’ (আল-ইসরা (১৭) : ১৮]

‘বল- সত্য এসে গেছে, আর মিথ্যের নতুন করে আবির্ভাবও ঘটবে না, আর তার পুনরাবৃত্তিও হবে না।’ [সাবা (৩৪) : ৪৯]

নাবী কারীম (সাঃ)-এর আঘাতে মূর্তিগুলো ভূপতিত হচ্ছিল।

নিজের (সাঃ) উটের পিঠে আরোহণ করে তাওয়াফ সম্পন্ন করেন এবং ইহরাম অবস্থায় না থাকার কারণে শুধু তাওয়াফ করাই যথেষ্ট মনে করেন। তাওয়াফ সম্পন্ন করার পর উসমান বিন ত্বালহাহ (রাঃ)-কে ডেকে নিয়ে তাঁর কাছ থেকে কা‘বা ঘরের চাবি গ্রহণ করেন। অতঃপর তাঁর নির্দেশক্রমে কা‘বা ঘর খোলা হয় এবং তিনি ভিতরে প্রবেশ করেন। এ সময় অভ্যন্তরস্থিত ছবিগুলো তাঁর দৃষ্টিগোচর হয়। তাঁদের মধ্যে ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আঃ)-এর প্রতিকৃতদ্বিয়ও ছিল। তাঁদের হাতে ভবিষ্যত কথন সম্পর্কিত তীর ছিল। এ দৃশ্য দেখে বললেন, ‏قَاتَلَهُمُ اللهُ، وَاللهُ مَا اسْتَقْسَمَا بِهَا قَطٌّ ‘আল্লাহ তা‘আলা ঐ সকল মুশরিকদেরকে ধ্বংস করুন! আল্লাহর কসম! ঐ দু’ জন কখনই ভবিষ্যত জানার জন্য এ ধরণের তীর ব্যবহার করেন নি।

কা‘বাহ ঘরের অভ্যন্তরে কাঠের তৈরি একটি কবুতরীর প্রতিকৃতিও তাঁর চোখে পড়ে। এ প্রতিকৃতিটি তিনি নিজ হাতে সম্পূর্ণভাবে  ধ্বংস করে ফেলেন। অন্যান্য মূর্তিগুলোকেও তাঁর নির্দেশে মুছে ফেলা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button